ভারত-বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও সুপরিচিত কবি-সাহিত্যিক মাধুরী ব্যানার্জীর লেখা অণুগল্প : রঙিন অক্ষরের পান্ডুলিপি
গ্রামের মানুষ তাঁকে ডাকত—”রঙিন মানুষ”। কারণ তাঁর কলমে কখনও কালো কালি দেখা যেত না। কখনও নীল, কখনও সবুজ, কখনও লাল, আবার কখনও সোনালি রঙে তিনি লিখতেন।
একদিন কৌতূহলী কিশোরী মেঘলা সাহস করে জিজ্ঞেস করল, — “দাদু, আপনি এত রঙ দিয়ে লেখেন কেন?”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, — “কারণ জীবনের প্রতিটি অনুভূতির নিজস্ব একটি রং আছে। দুঃখ যদি ধূসর হয়, তবে আশা সবুজ। ভালোবাসা লাল, ক্ষমা সাদা, আর স্বপ্ন নীল। কালো কালি সব অনুভূতিকে এক করে দেয়, কিন্তু আমি চাই প্রতিটি অনুভূতি আলাদা হয়ে বেঁচে থাকুক।”
সেদিন থেকেই মেঘলা প্রতিদিন তাঁর পাশে বসে গল্প শুনত। বৃদ্ধ বলতেন, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, স্মৃতি; সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতা নয়, সহানুভূতি; আর সবচেয়ে বড় পরিচয় নাম নয়, কর্ম।
বছর ঘুরে গেল। এক বর্ষার সকালে খবর এল—অচিন্ত্য সেন আর নেই।
পাঠাগারের টেবিলের ওপর পড়ে ছিল তাঁর অসমাপ্ত একটি পাণ্ডুলিপি। নাম—”রঙিন অক্ষরের পাণ্ডুলিপি”।
গ্রামের সবাই বইটি খুলে অবাক হয়ে গেল। প্রতিটি পাতায় রঙিন অক্ষরে লেখা ছিল গ্রামের মানুষের গল্প। কারও অজানা ত্যাগ, কারও নীরব কান্না, কারও গোপন স্বপ্ন, কারও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা—সবই যেন রঙের ভাষায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।শেষ পাতায় মাত্র কয়েকটি লাইন লেখা ছিল—
“যেদিন মানুষ অন্যের জীবনেও নিজের রঙের একটু আলো ছড়িয়ে দিতে শিখবে, সেদিন পৃথিবীর প্রতিটি বই রঙিন হয়ে উঠবে। কারণ রঙ কালি থেকে জন্মায় না, জন্মায় মানুষের হৃদয় থেকে।”
মেঘলা সেই পাণ্ডুলিপি নতুন করে প্রকাশ করল। বইটি পড়ে মানুষ বুঝতে শুরু করল—জীবনের সৌন্দর্য কেবল সুখের গল্পে নয়, সংগ্রাম, ক্ষমা, মমতা আর আশার রঙেও লুকিয়ে থাকে।
সেই পুরোনো পাঠাগার আবার ভরে উঠল পাঠকের পদচারণায়। নতুন প্রজন্ম বই পড়তে শিখল, লিখতে শিখল, আর সবচেয়ে বড় কথা—মানুষের মনকে রঙিন করে তুলতে শিখল।
অচিন্ত্য সেন আর নেই, কিন্তু তাঁর “রঙিন অক্ষরের পাণ্ডুলিপি” আজও প্রতিটি পাঠককে মনে করিয়ে দেয়—একটি সুন্দর বাক্য যেমন জীবন বদলে দিতে পারে, তেমনি একটি সুন্দর হৃদয়ও পৃথিবীকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দিতে পারে।