সুলেখা আক্তার শান্তা

রাস্তা দিয়ে হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে উজালা বুড়ি। তার এক হাতে শক্ত করে ধরা নাতি মনিরের হাত, আর অন্য হাতে একটা মজবুত লাঠি। উজালা বুড়ির বয়স হয়েছে তাই তার গায়ে শক্তি কম, চোখেও দেখে ঝাপসা, এখন লাঠিই তার ভরসা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে , রাস্তার পাশ দিয়ে একটু দ্রুতই হাঁটছিল।
হঠাৎ উজালা থমকে দাঁড়াল। রাস্তার ঠিক ধারেই বড় একটা গোলমতো কী যেন পড়ে আছে। উজালা চোখ কুঁচকে দেখার চেষ্টা করল। বিড়বিড় করে বলল, কিরে, এটা কীসের বস্তা? কে ফেলে রাখল মাঝরাস্তায়?
মনের খটকা দূর করতে উজালা হাতের লাঠিটা উঁচিয়ে ধরল। তারপর সজোরে ওটার গায়ে একটা গুঁতা মারল। ওটা নড়ল না। উজালা এবার আরও একটু শক্তি দিয়ে দ্বিতীয়বার একটা গুঁতা দিলো। আর অমনি দলা পাকিয়ে থাকা জিনিসটা গড়িয়ে রাস্তার ঢাল দিয়ে নিচের দিকে পড়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই নিচ থেকে এক করুণ শব্দ ভেসে এলো— ‘উঁউঁ… ওরে বাবারে!’
উজালা আর মনির দুজনেই থমকে গেলো। উজালা ঝাপসা চোখে দেখল, নিচ থেকে ময়লা মাখা এক মূর্তির মতো কিছু একটা আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠে আসছে। উজালা তো ভয়ে অস্থির! সে ভাবল বুঝি কোনো ভূত-প্রেত উঠে আসছে। কিন্তু কাছে আসতেই মনির চিৎকার করে উঠল, দাদি, ও তো দেখি মানুষ!
উজালা চশমাটা ঠিক করে নিয়ে বলল, হ রে নাতি, আমি তো তাই দেখতেছি! আমি তো ভাবছি কিসের যেন একটা বস্তা!
সাইয়েদ ঝাড়পোছ করে সামনে এসে দাঁড়াল। বেশ বিরক্ত হয়ে বলল, চাচি, তুমি আমারে অমন করে গুঁতা মারলা কেন? আমি কি মানুষ না বস্তা?
উজালা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, আরে বাবা, আমি কি আর সাধ করে মেরেছি? চোখে তো সব আন্ধার দেখি, কিসে কী দেখে গুঁতা মারলাম আমি নিজেও জানি না। তা তুই এখানে এভাবে দলা পাকিয়ে বসেছিলি কেন?
সাইয়েদ একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে পড়ল। মুখটা কালো করে বলল, চাচি, খুব চিন্তায় আছি। উজালা ধমক দিয়ে বলল, চিন্তার আবার কী হলো? চিন্তা করে কি কখনো চিন্তা দূর করা যায়? এই যে দেখস না আমার এই ছোট নাতিরে নিয়ে আমি দিনরাত পড়ে আছি, আমার কি চিন্তা হয় না? কিন্তু আমি চিন্তা করি না। যা আছে কপালে তাই হবে।
সাইয়েদ কাঁচুমাচু হয়ে বলল, চাচি, আমার জন্য একটু দোয়া করেন যেন জীবনের এই দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে পারি।
উজালা মাথাটা একটু দোলাল। তারপর বলল, দোয়া চাস? আচ্ছা, করব তোর জন্য দোয়া। তবে তার জন্য একটা ‘ফি’ বা মজুরি লাগবে। কি বলিস নাতি? মনির দাদির সায় দিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল, হ দাদি, ঠিক বলছ। দোয়া করমু, তার জন্য একটা মজুরি দিতে হইব না?
সাইয়েদ মুখ গোমরা করে বলল, চাচি, টাকা-পয়সা নাই দেখেই তো দুর্দশায় আছি। এখন দোয়ার টাকা পাব কই? মনির অমনি পাকনা ছেলের মতো হাত নেড়ে বলল, টাকা নাই তো দোয়া নাই, দোয়ার বরকতও নাই!
সাইয়েদ অবাক হয়ে বলল, এই ছেলে, তুই এত পাকনা হয়েছিস কেন? তোর বয়সে আমি তো কিছুই বুঝতাম না। উজালা হেসে বলল, শোন সাইয়েদ, যার বুদ্ধি হওয়ার তা এই বয়সেই হয়। এখন বল, দোয়া লাগবে কি না? সাইয়েদ নিরুপায় হয়ে বলল, ঠিক আছে চাচি, দোয়া করেন। মনির অমনি ঘোষণা দিলো, দোয়ার দাম কিন্তু দুই হাজার টাকা!
সাইয়েদ আকাশ থেকে পড়ল, বলো কী! দোয়া নাকি দুই হাজার টাকা? উজালা গম্ভীর হয়ে বলল, কেন রে, তোর পছন্দ হয়নি আমার নাতির কথা? আমার নাতি যা বলে আমি তাই মেনে চলি। এর আগে-পিছে কোনো কথা নেই। দোয়ায় দুই হাজার টাকা লাগবে।
অগত্যা সাইয়েদ রাজি হলো। উজালা প্রাণভরে দোয়া করল সাইয়েদের যেন অনেক টাকা-পয়সা হয়। দোয়া শেষে উজালা মনে করিয়ে দিলো, টাকাটা কিন্তু বাকি থাকল, তাড়াতাড়ি দিয়ে দিস। মনির পাশ থেকে ফোড়ন কাটল, দাদি, গুরুজনরা বলে—বাকি কাম ফাঁকি হয়!
এরপর দাদি-নাতি রওনা হলো আমির হোসেনর বাড়ির দিকে। সেখানে দাওয়াত ছিল। পৌঁছাতে একটু দেরি হয়ে গেল। উজালা গিয়েই হাঁক ছাড়ল, এই আমির, খাইতে দে! নাতি নিয়ে আইছি। আমির হোসেন কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ও চাচি, খাওয়া-দাওয়া তো শেষ। দেখি কিছু আছে কি না।
উজালা রেগে আগুন! কী! আমাকে দাওয়াত দিয়ে এখন বলিস খাবার আছে কি না? না, আমি এমন খাবার খাই না যেখানে মেহমানের জন্য খাবার থাকে না। চল নাতি! মনির দাদির আঁচল ধরে বলল, দাদি, তুমি টাকা চাও। আমরা যে সাইয়েদকে দোয়া করলাম, সেই দোয়ার টাকা দিয়ে আমরা ভালো মন্দ কিনে খাব।
সাইয়েদ তখন ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল, চাচি, তোমার নাতি আবার কী কয়! চাচি তোমারে আর তোমার নাতিরে, মানুষ তো ভালোবেসে তোমাদের টাকা দেয়। আর তোমরা এখন দোয়ার জন্য টাকা দাবি করছো?
উজালা তেজের সাথে বলল, আমরা কারোটা এমনি খাই না। সাইয়েদ, তুই আমাদের সাথে চালাকি করিস না। আমাদের দোয়ার টাকা দিয়ে দে। সাইয়েদ দিতে চায় না। অনেক ক্যাঁচাল করার পর আমির তাকে পাঁচশত টাকা দিলো। উজালা সেটা হাতে নিয়ে বলল, পাঁচশত টাকায় আজকের বাজারে দোয়া হয় না! বাকি টাকা পরে দিবি।
বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। সাইয়েদ আর টাকা দেয় না। মনির প্রতিদিন দাদিকে মনে করিয়ে দেয়। একদিন দুজনে মিলে সাইয়েদের বাড়ি গিয়ে হাজির হলো। উজালা গিয়েই বলল, তুই যে আমার টাকা দিলি না সাইয়েদ? মনিরও গলা চড়িয়ে বলল, টাকা কি অন্যের পকেটে এভাবে ফেলে রাখা যায়?
সাইয়েদ এবার খেপে গেল। চাচি, আমার কাছে টাকা নাই। আর কি এমন দোয়া করছো যে তার জন্য এভাবে চাপ দিয়ে টাকা নিবা? উজালা গজগজ করতে করতে বলল, ঠিক আছে, তুই যখন এমনি দিবি না, তবে চল মজিদ মাতবরের কাছে।
মজিদ মাতবরের বাড়িতে গিয়ে উজালা চিৎকার শুরু করল। মাতবর বাড়িতে ছিলেন না, তার স্ত্রী নাহার রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখল। কিছুক্ষণ পর মাতবর মজিদ বাড়িতে ঢুকলে উজালা বলল, বাবা মজিদ, আমার একটা বিচার করে দাও। এই সাইয়েদ আমার দুই হাজার টাকা দেয় না।
মজিদ অবাক হয়ে বলল, চাচি, কিসের টাকা? উজালা বলল, আমি ওকে দোয়া করে দিয়েছি, সেই দোয়ার ফি। মজিদ আর তার স্ত্রী নাহার তো হেসেই কূল পায় না। নাহার হাসতে হাসতে বলল, ওমা! দোয়ার আবার ফি আছে নাকি!
মনির রাগ করে বলল, হাসেন কেন? মানুষ অন্য কাজ করে টাকা নেয়, আর আমরা দোয়া করে টাকা নিচ্ছি। কষ্ট হয় না দোয়া করতে? উজালা সায় দিয়ে বলল, হ্যাঁ নাতি, সবকিছুরই একটা ফি আছে।
মজিদ মাতবর দেখলেন উজালা বুড়ি আর এই পিচ্চি ছেলের সাথে তর্কে পেরে ওঠা যাবে না। তিনি নিজের মানিব্যাগ থেকে দুই হাজার টাকা বের করে উজালার হাতে দিলেন। তারপর হেসে বললেন, চাচি, সাইয়েদ তো গরীব মানুষ, ও টাকা কই পাবে? এই নাও আমিই দিয়ে দিলাম। আর আমি পুরো গ্রামরে বলে দিব—আজ থেকে উজালা চাচির দোয়ার ফি দুই হাজার টাকা, পাকাপোক্ত হলো!
উজালা আর মনির খুশিতে ডগমগ হয়ে টাকাটা হাতে নিলো। মনির বলল, দেখছ দাদি, মাতবর ঠিক কথাই বলছে। কাজ করলে তার ফি দিতেই হয়। উজালা লাঠি ঠুকতে ঠুকতে নাতির হাত ধরে বাড়ির পথে রওনা হলো। আজ তাদের মুখে জয়ের হাসি!
পোস্টটি শেয়ার করুনঃ