বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক মাধুরী ব্যানার্জীর লেখা অণুগল্প : অনুভূতির খেয়ালে
অনুভূতির খেয়ালে
-মাধুরী ব্যানার্জী
বর্ষার শেষ বিকেল। ছোট্ট শহরের রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল অনিন্দিতা। হাতে একটি পুরোনো ডায়েরি। ডায়েরির প্রতিটি পাতায় জমে আছে না বলা কথা, অপূর্ণ স্বপ্ন আর হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি।
অনিন্দিতা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা। হাসিমুখে সবাইকে পড়ালেও নিজের জীবনের গভীর শূন্যতার কথা কাউকে কখনও বলেনি। নিজের কষ্ট থেকেই সে শিখেছিল—কান্না লুকিয়ে রেখে হাসতে।
একদিন স্কুলে নতুন যোগ দিলেন অরিন্দম, বাংলা শিক্ষক। সাহিত্যপ্রেমী, শান্ত স্বভাবের মানুষ। ছাত্রছাত্রীদের গল্প শুনিয়ে পড়াতেন। একদিন ক্লাসে বললেন, —”জীবনের সবচেয়ে বড় ভাষা শব্দ নয়, অনুভূতি।”
কথাটা অনিন্দিতার মনে দাগ কেটে গেল।
ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। একদিন অরিন্দম জানতে চাইল, —”আপনি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন কেন?”
অনিন্দিতা হেসে বলল, —”সব গল্প বলা যায় না। কিছু গল্প শুধু অনুভূতির খেয়ালে বেঁচে থাকে।”
এরপর এক বর্ষার সন্ধ্যায় অরিন্দম অনিন্দিতাকে একটি খালি ডায়েরি উপহার দিল। প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
“অতীতের অশ্রু নয়, আগামী দিনের হাসি লিখুন। জীবন অপেক্ষা করছে।”
সেই রাতেই অনিন্দিতা পুরোনো ডায়েরির শেষ পাতায় লিখল—
“যে স্মৃতি আমাকে কাঁদিয়েছে, তাকে আজ ধন্যবাদ। কারণ সেই স্মৃতিই আমাকে অন্যের চোখের জল বুঝতে শিখিয়েছে।”
কয়েক মাস পরে স্কুলে “অনুভূতির খেয়ালে” নামে একটি গল্পলেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো। অনিন্দিতা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একটি গল্প লিখল। গল্পটি প্রথম পুরস্কার পেল। বিচারক বললেন,
—”এই গল্পের সৌন্দর্য ভাষায় নয়, সত্যিকারের অনুভূতিতে।”
পুরস্কার হাতে নিয়ে অনিন্দিতা বুঝল, জীবনের ক্ষত কখনও কখনও মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে। হারিয়ে যাওয়া মানুষ ফিরে আসে না, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া ভালোবাসা নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
স্টেশনের সেই পুরোনো বেঞ্চে বসে অনিন্দিতা আকাশের দিকে তাকাল। মেঘের ফাঁক দিয়ে এক টুকরো রোদ নেমে এসেছে। তার মনে হলো, অনুভূতির খেয়ালে ভেসে চলা জীবনই হয়তো সবচেয়ে সত্য—যেখানে দুঃখ মানুষকে ভাঙে না, বরং আরও গভীর, আরও সুন্দর করে গড়ে তোলে।
মানুষের জীবনে অনুভূতি দুর্বলতা নয়; সঠিকভাবে তাকে গ্রহণ করতে পারলে সেই অনুভূতিই নতুন স্বপ্ন, সাহস এবং জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়ার পথ দেখায়।