রাতের আকাশে তারাগুলো একে একে ফুটে উঠেছে। উঠানের খাটে শুয়ে আছেন দেলো চাচা। হালকা বাতাস বইছে, দূরে কোথাও শোনা যাচ্ছে শিয়ালের ডাক। চোখ বন্ধ করতেই তিনি ফিরে গেলেন বহু বছর আগের সেই দিনগুলোতে—যখন তিনি ছিলেন ছোট্ট “দেলো”, বাবার ছায়াসঙ্গী।
তখনকার গ্রাম আজকের মতো ছিল না। কাঁচা রাস্তা বর্ষায় হাঁটুসমান কাদায় ডুবে যেত। বিদ্যুৎ ছিল না, সন্ধ্যা নামলেই কুপির আলোয় ঘর আলোকিত হতো। কৃষিকাজের প্রধান ভরসা ছিল গরুর লাঙল। মানুষের হাতে ছিল না আধুনিক যন্ত্র, ছিল শুধু কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য মনোবল।
দেলোর বাবা আব্দুর রহমান ছিলেন একজন সৎ ও পরিশ্রমী কৃষক। নিজের জমি খুব বেশি ছিল না। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করতেন। সারা দিনের পরিশ্রমের পরও সংসারে অভাব লেগেই থাকত। কিন্তু তিনি কখনো অসৎ পথে হাঁটেননি।
একদিন ভোরে বাবা বললেন,
— “দেলো, আজ আমার সঙ্গে মাঠে চলবি?”
দেলোর চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল।
— “আমি কি লাঙল ধরতে পারব বাবা?”
বাবা হেসে বললেন,
— “আজই তো শেখাব।”
সেই প্রথম দেলো বাবার সঙ্গে মাঠে গেল। কুয়াশা ভেজা মাঠ, গরুর গলায় ঘণ্টার শব্দ আর ভেজা মাটির গন্ধ—সবকিছু তার কাছে নতুন এক জগৎ।
বাবা গরু জোতা লাগিয়ে লাঙল ধরলেন। কিছুক্ষণ পর ছেলেকে কাছে ডেকে বললেন,
— “এসো, এবার তুমি ধরো।”
দেলোর ছোট ছোট হাত লাঙলের কাঠ শক্ত করে ধরল। কিন্তু কয়েক কদম যেতেই ভারসাম্য হারিয়ে কাদার মধ্যে পড়ে গেল। মাঠজুড়ে হাসির রোল উঠল। দেলো লজ্জায় মাথা নিচু করল।
বাবা এগিয়ে এসে তাকে তুলে বললেন,
— “কাঁদবি না। যে পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে শেখে, সেই-ই একদিন সত্যিকারের কৃষক হয়।”
সেই কথাগুলো দেলোর হৃদয়ে গেঁথে গেল।
এরপর থেকে প্রতিদিন স্কুলের আগে কিংবা পরে সে মাঠে যেত। কখনো বীজ ছড়াত, কখনো আগাছা পরিষ্কার করত, কখনো গরুকে ঘাস খাওয়াত। কৃষিকাজ তার কাছে শুধু কাজ ছিল না, ছিল জীবনের শিক্ষা।
কিন্তু সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। এক বছর ভয়াবহ বন্যা হলো। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে নদীর বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ল মাঠে। চোখের সামনে সব ধানের ক্ষেত ডুবে গেল। পাকা ফসল ভেসে গেল স্রোতের সঙ্গে।
বাবা মাঠের দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। দেলো দেখল, শক্ত মানুষটির চোখেও জল।
সে ধীরে ধীরে বাবার হাত ধরল।
— “বাবা, সব শেষ?”
বাবা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “না রে। কৃষকের সব কখনো শেষ হয় না। মাটি আবার ডাকবে, আমরা আবার বীজ বুনব।”
সেই দিন দেলো বুঝেছিল, কৃষকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার আশা।
বন্যার পরে সংসারে নেমে এল চরম অভাব। ঘরে চাল নেই, নতুন কাপড় নেই। অনেক দিন শুধু ভাত আর লবণ খেয়ে কাটাতে হয়েছে। তবু দেলোর মা কখনো সন্তানদের সামনে নিজের কষ্ট প্রকাশ করতেন না। তিনি বলতেন,
— “অভাব মানুষকে ছোট করে না, অলসতা মানুষকে ছোট করে।”
মায়ের এই কথাও দেলোর জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে যায়।
একদিন গ্রামের স্কুলের শিক্ষক বাড়িতে এলেন। তিনি দেলোর বাবাকে বললেন,
— “ছেলেটা খুব মেধাবী। পড়াশোনা বন্ধ করবেন না।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— “স্যার, ইচ্ছা তো আছে। কিন্তু পেটের দায়ও তো আছে।”
শিক্ষক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— “যতদিন পারি, আমি বইয়ের ব্যবস্থা করব। ছেলেটাকে স্বপ্ন দেখতে দিন।”
সেই দিন দেলো উপলব্ধি করল, একজন শিক্ষক শুধু পড়ান না, মানুষের ভবিষ্যৎও গড়ে দেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেলো বড় হতে লাগল। এখন সে একাই লাঙল ধরতে পারে, গরু সামলাতে পারে, জমির পরিচর্যা করতে পারে। গ্রামের মানুষ বলতে শুরু করল,
— “ছেলেটা একদিন ভালো কৃষক হবে।”
কিন্তু দেলোর মনে তখনও একটি স্বপ্ন ছিল—সে শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়, পুরো গ্রামের মানুষের জন্য কাজ করবে। কৃষকদের দুঃখ-কষ্ট কমাতে চাইবে, নতুন পদ্ধতিতে চাষ শিখবে, আর প্রমাণ করবে যে কৃষকের জীবন সম্মানের জীবন।
সেদিন সন্ধ্যায় বাবা তাকে উঠানে বসিয়ে বললেন,
— “শোন দেলো, জমি মানুষকে শুধু ফসল দেয় না, চরিত্রও গড়ে। যে মাটিকে ভালোবাসে, মানুষও তাকে ভালোবাসে।”
দেলো বাবার পায়ে হাত রেখে বলল,
— “বাবা, আমি তোমার শেখানো পথ কখনো ছাড়ব না।”
দূরে তখন সন্ধ্যার আকাশে প্রথম তারা জ্বলছে। কেউ জানত না, এই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন গ্রামের সবার প্রিয় “দেলো চাচা” হয়ে উঠবে—যার জীবন হবে সংগ্রাম, ভালোবাসা আর মাটির প্রতি অগাধ বিশ্বাসের এক অনন্য গল্প।
চলবে…