1. newsofbangla247@gamil.com : Newsofbanglatv : newsofbanglatv newsofbanglatv
বীর তো আমার মা” - News Of Bangla TV বীর তো আমার মা” - News Of Bangla TV
July 29, 2026, 3:49 pm

বীর তো আমার মা”

সুলেখা আক্তার শান্তা
  • Update Time : Wednesday, July 15, 2026
  • 96 Time View

“বীর তো আমার মা”

সুলেখা আক্তার শান্তা

মুক্তিযুদ্ধের আগের কথা। তিস্তার জল যেমন চঞ্চল, তেমনি চঞ্চল ছিল রানীর হৃদয়। পড়াশোনা শেষ করে গ্রামে ফিরে রফিক। রফিক যখন প্রথম রানীকে দেখে সে তার প্রেমে পড়ে যায়। রানী তখন জানত না এই ভালোবাসাই হয়ে উঠবে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। রফিক শহর থেকে আসা উন্নত চিন্তার যুবক, সাদা পাঞ্জাবি আর গায়ে হালকা ‘ইভিনিং ইন প্যারিস’ এর ঘ্রাণ। গ্রামের মেঠো পথে রানীর সাথে তার কথা বলার ভঙ্গি, চোখে চোখ রাখার ঢঙ সবই ছিল শহুরে। রানী প্রেমে পড়ে গেল রফিককের অনায়াসেই।

প্রেমের পরিণতি নিয়ে মানুষের যত অন্বেষণ। কিন্তু রানীর জীবনে সেই পরিণতি এলো অঘোষিত, কঠিন এক সত্য হয়ে। ২৫শে মার্চের ঘন রাতে, তখন পুরো দেশ জ্বলছিল পাকিস্তানি হানাদারদের আগুনে। রানীর গর্ভে অঙ্কুরিত হয়ে উঠছিল এক নতুন প্রাণ। রফিককের সঙ্গে শেষ দেখা সেদিন রাতেই। ‘যুদ্ধ শেষে ফিরবো,’ বলে চলে গেল সে। রানী জানত না, ফিরে এসে রফিক তাকে চিনবে কিনা। রফিক চলে গেছে অস্ত্র হাতে, আর রানী থেকে গেছে নিজ জঠরে সেই অজানা ভবিষ্যৎ নিয়ে। রানী বুঝতে পারল এই রাত শুধু দেশের ইতিহাস বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছে তার নিজের জীবনটাকে।

প্রথম কয়েকদিন তো কিছুই বুঝতে পারেনি সে। শুধু মনে হতো, পেটে যেন একটা আগুন জ্বলছে রফিককের ভালোবাসার আগুন। ডাক্তার যখন নিশ্চিত করল, ‘তুমি মা হতে চলেছ,’ রানীর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরল। কিন্তু সেই অশ্রু কি সুখের? নাকি ভয়ের সে নিজেও জানত না।

সময়ের পিঠে চড়ে সন্তর্পণে দিন মাস হয়ে এগিয়ে চলে মহাকাল। জানালা দিয়ে সে দেখতো দূর আকাশের ধোঁয়া। কখনো শুনত ভস্মীভূত জনপদে মানুষের সমবেত আত্মচিৎকার। পাকিস্তানি হেলিকপ্টারে ঘূর্ণায়মান শব্দ শুনলে তার গর্ভের সন্তান লাথি মারত যেন সেও বুঝতে পারত বাইরের বিপদ। রানী প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় আকাশের দিকে তাকিয়ে বলত, ‘আমার দেশ যেন বাঁচে, আমার রফিক যেন বাঁচে, আর এই শিশু যেন জন্মায় এক স্বাধীন দেশে।’ সবচেয়ে কঠিন ছিল মন-মানসিকতার লড়াই। গ্রামের বুড়িরা কানে কানে বলত, ‘যুদ্ধের সময় যে সন্তান হয়, তার কী হবে?’ কেউ বলত, ‘রফিক তো ফিরবে না, যুদ্ধে মরবে।’ রানী সব কথা শুনত, কিন্তু কানে তুলত না। সে ওই অনাগত শিশুর সাথে কথা বলত ‘তুই বাঁচবি, আমি বাঁচাবো। তোর বাবা ফিরবে, আমি জানি।’

গর্ভের সন্তান যত বাড়ত, রানীর আশাও তত বাড়ত। সে যখন পেটে হাত বুলাত, অনুভব করত ভেতরে একটা পৃথিবী গড়ে উঠছে, ঠিক যেমন বাইরে গড়ে উঠছে স্বাধীন বাংলাদেশ। একদিন সে টের পেল, শিশুটা থুত্থুরি মারছে। রানী হেসে উঠত। বলত, ‘তুই যুদ্ধের সন্তান, তোকে লড়তে হবে জানিস?’ সেই হাসির ভেতরেই ছিল অশ্রু, আর অশ্রুর ভেতরেই ছিল অটুট বিশ্বাস।

বর্ষা এলো, নদীতে পানি বেড়ে গেলো। রানী ভাবল, এই বন্যা যেমন তিস্তার স্রোত বাড়ায়, তেমনই তার গর্ভের শিশুও বাড়ছে। সে শুনত মুক্তিবাহিনীর খবর কোথায় গেরিলা হামলা, কোথায় বিজয়। প্রতিটি খবরেই সে খুঁজত রফিককের নাম। যদিও নাম পেত না, তবু মনে হত, হয়তো আজকের এই হামলায় রফিক আছে। রাতে ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্ন দেখত রফিক ফিরে এসেছে, তার পেটে হাত রেখে বলত, ‘আমাদের সন্তান।’

তখন অগ্রহায়ণ মাস যখন দেশের আকাশ থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উঠালো, রানী জানালার বাইরে তাকিয়ে কাঁদল। কান্নার ভেতরেও হাসি। সে বলত, ‘দেখ, তোর দেশ স্বাধীন হয়ে গেলো। এখন শুধু তোর বাবা ফিরলেই হয়।’ কিন্তু সেই অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো। যুদ্ধ শেষ হলে শুরু হলো শরণার্থী ফেরার পালা। প্রতিদিন সে দাঁড়িয়ে থাকত রাস্তার ধারে, কোনো পরিচিত মুখ দেখতে পায় কিনা।

নয় মাস শেষ হলো। গর্ভের শিশু এখন রানীর পেট এত বড় যে দাঁড়াতে কষ্ট হয়। তবুও সে প্রতিদিন যায় পোস্ট অফিসে রফিককের কোনো চিঠি এসেছে কিনা। কখনো আসে না। কিন্তু রানী বলে, ‘আসবে, একদিন আসবে। যেমন দেশ স্বাধীন হয়েছে, তেমনি আমার রফিকও ফিরবে।’

অবশেষে এক শীতের সকালে সে খবর পেল রফিক ফিরেছে। বুকের ভেতর একটা উল্লাস হলো, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল তার গর্ভের সন্তানের কথা। রানী দর্পণে নিজের মুখ দেখল। এতদিনের অপেক্ষা, এত রাতের জাগরণ, গর্ভে লালিত এই সন্তান সবই তো রফিককের জন্য। সে ভাবল, ‘সে ফিরেছে, এখন সব ঠিক হবে।’ কিন্তু যখন রফিক তার সামনে দাঁড়াল, তার চোখ রানীর গর্ভে দিকে। প্রথম প্রশ্ন -‘এটা কার?’ সেই মুহূর্তে রানী বুঝতে পারল, নয় মাসের এই লালন শুধু সন্তানের জন্য ছিল না, ছিল নিজের আত্মবিশ্বাস গড়ার জন্য। দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রফিককের মন তখনো মুক্ত হয়নি। আর রানী? সে জেনে গেছে একজন মানুষ একা হলেও পারে, সন্তানকে লালন করতে পারে, আশা বাঁচিয়ে রাখতে পারে। কারণ আশা আর সন্তান দুটোই তার নিজের।

রফিক হেসে উঠল। সেই হাসির মধ্যে ছিল যুদ্ধের বিভীষিকায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক পুরুষের সংশয়। ‘যুদ্ধের সময় এ দেশে যা হয়েছে, রানী, তা তুমি জানো না। তারপর বলল, ‘গর্ভপাত করাও। সূচি শুদ্ধ হয়ে ফিরে এসো। আমি বিয়ে করব তোমাকে।’ রানীর মনে হলো যেন শতাব্দীর সব ঘৃণা একসাথে জমা হয়েছে তার বুকে। সে দাঁড়িয়ে রইলো বজ্র কঠিন দৃঢ়তায়। তারপর নীরবে রফিককের দিকে তাকিয়ে বলল, এটা আমার সন্তান। আর আমি তার মা। আমার রক্ত মাংসে গড়ে উঠেছে এই সন্তানের অস্তিত্ব। আমার রক্ত মাংস যদি পবিত্র হয় তবে এই সন্তানও পবিত্র। তুমি যা চাও, তা আমি কখনো করতে পারবো না এবং করব না।

রফিক চলে গেলো। শুরু হলো রানীর জীবন সংগ্রাম। গ্রামের মানুষ কথা বলল, সমাজ তাকে ঘৃণার চোখে দেখল, পরিবার করল ত্যাগ। কিন্তু রানী একা হয়ে গেলেও দৃঢ় ছিল তার বিশ্বাস। একদিন আদালতের বিচারে এই সন্তান পাবে তার পিতৃত্বের অধিকার। কারণ সত্য তো সত্যই, কে তা অস্বীকার করতে পারে?
রানী সন্তান পৃথিবীতে এলো। সে সন্তানের নাম রাখল ‘স্বাধীন’। শুধু দেশে স্বাধীনের জন্যই না, তার নিজের মুক্তির জন্যও।

দশ বছর কেটে গেল। স্বাধীন বড় হলো, রানী হয়ে উঠল একজন সফল ব্যবসায়ী। আর তখনই একদিন আদালতের বারান্দায় রফিককের সাথে তার দেখা। রফিককের চোখে স্বাধীন, স্বাধীনের চোখে রফিক দু’জনের মাঝে রানী। আদালত রায় দিলো, স্বাধীন রফিককের সন্তান, তাকে পিতৃত্বের অধিকার দিতে হবে।
বিচারকের রায় শুনে রফিককের মুখ ফ্যাকাশে। রানী তখন স্বাধীন হাত ধরে রফিককের সামনে দাঁড়াল। ‘আমি চাই না কোনো অধিকার,’ সে বলল, ‘আমি শুধু চেয়েছিলাম স্বীকৃতি। যে সন্তান তুমি অস্বীকার করেছিলে, সেই সন্তান আজ প্রমাণ করল সত্য কখনো মরে না।’
রানী মুখ ফিরিয়ে নিল। তার দীর্ঘ সংগ্রামের অবসান হলো নিঃশব্দে। জানালার বাইরে তিস্তা তখনও বয়ে চলেছে, যেমন বয়ে চলেছে সময়। দেশ স্বাধীন হয়েছে, রানী স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু রফিক এখনো বন্দী তার নিজের সংশয় আর অহংকারের কারাগারে। আর স্বাধীন! সে মুক্ত, এক নতুন প্রজন্মের সন্তান, যে জানে‌ মা তার প্রথম পৃথিবী। স্বাধীন রফিককের দিকে তাকাল। দশ বছরের ছেলেটি বলল, ‘আমার বাবা তুমি, কিন্তু বীর নও বীর তো আমার মা।’

See also  দেলো চাচা

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

BD IT HOST