ধারাবাহিক উপন্যাস
মোঃ নাজির হোসেন
(কৃষক–গ্রামীণ জীবনের এক অমলিন কাব্য)
অধ্যায়–১ :
পূর্ব আকাশে তখনও সূর্যের রক্তিম আভা পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চারদিকে কুয়াশার পাতলা চাদর। বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসছে শালিকের ডাক, দূরের মসজিদ থেকে ফজরের আজানের শেষ ধ্বনি মিলিয়ে যাচ্ছে গ্রামের নিস্তব্ধতায়। শিশিরে ভেজা ধানের পাতাগুলো মুক্তোর মতো ঝলমল করছে। এ যেন প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা এক জীবন্ত ছবি।
এই গ্রামের নাম সোনাপুর। ছোট্ট একটি গ্রাম, কিন্তু প্রাণে ভরপুর। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সরু একটি খাল। বর্ষায় সেটি নদীর রূপ নেয়, আর শুষ্ক মৌসুমে শিশুদের খেলাঘর হয়ে ওঠে। কাঁচা রাস্তার দুই পাশে তাল, খেজুর, নারকেল আর আমগাছের সারি। সন্ধ্যা হলে শোনা যায় ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর শীতের রাতে দূর থেকে ভেসে আসে শেয়ালের হাঁক।
এই গ্রামেই থাকেন দেলো চাচা।
তার আসল নাম আব্দুল জলিল। কিন্তু ছোটবেলা থেকে সবাই তাকে দেলো বলে ডাকে। সময়ের সঙ্গে সেই নামই স্থায়ী হয়ে গেছে। এখন গ্রামের ছোট-বড় সবাই তাকে “দেলো চাচা” বলেই চেনে।
দেলো চাচার বাড়িটি খুব সাধারণ। টিনের ছাউনি, মাটির উঠান, এক পাশে গোয়ালঘর, অন্য পাশে একটি পুকুর। উঠানের কোণে রয়েছে একটি পুরোনো আমগাছ। গাছটির নিচে বসেই তিনি বিকেলে চা পান করেন, গ্রামের মানুষের সঙ্গে গল্প করেন, কখনো কৃষির নানা অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন।
ফজরের নামাজ শেষে তিনি নীরবে উঠানে দাঁড়ালেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “হে আল্লাহ, আজকের দিনটাও যেন ভালো কাটে।”
ঘরের ভেতর থেকে তার স্ত্রী রহিমা বেগম ডাকলেন,
— “শুনছেন? চা তৈরি। খেয়ে তারপর মাঠে যাবেন।”দেলো চাচা মুচকি হেসে বললেন,
— “চা না খেলে শরীরই তো চলে না।”চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তিনি মাঠের হিসাব করতে লাগলেন। আজ নতুন জমিতে সেচ দিতে হবে। পাশের জমির ধানে পোকার আক্রমণ হয়েছে। নিজের জমিও দেখে আসতে হবে।
সূর্য ওঠার আগেই তিনি কাঁধে কোদাল তুলে বেরিয়ে পড়লেন। পথের ধারে দেখা হলো প্রতিবেশী করিমের সঙ্গে।
— “চাচা, এত সকালে?”
দেলো চাচা হেসে বললেন,
— “কৃষকের সকাল যদি দেরিতে হয়, তাহলে ফসলও রাগ করে।”করিম হেসে উঠল। এই কথাটাই যেন দেলো চাচার জীবনের দর্শন।
মাঠে পৌঁছে তিনি মাটিতে হাত রাখলেন। যেন বহুদিনের বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি মাটি হাতে নিয়ে গন্ধ শুঁকলেন। তারপর নিজের মনেই বললেন,
“এই মাটিই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।”সকালের কোমল আলোয় একে একে মাঠে হাজির হলো আরও কৃষক। কেউ লাঙল নিয়ে এসেছে, কেউ ট্রাক্টর, কেউ বীজের বস্তা। মাঠ ধীরে ধীরে কর্মব্যস্ত হয়ে উঠল।
দেলো চাচা কখনো কাউকে ছোট করে কথা বলেন না। গ্রামের তরুণ কৃষকেরা প্রায়ই তার কাছে পরামর্শ নিতে আসে।
রবিন নামে এক যুবক বলল,
— “চাচা, এবার কোন জাতের ধান লাগালে ভালো হবে?”দেলো চাচা ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন,
— “শুধু বীজ ভালো হলেই হবে না বাবা। মাটির যত্ন নিতে হবে। মাটি যদি হাসে, ফসলও হাসবে।”রবিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
দুপুরের দিকে রোদ চড়ে গেল। মাঠের ওপর যেন আগুন ঝরছে। অনেকেই কাজ থামিয়ে গাছের ছায়ায় বসেছে। কিন্তু দেলো চাচা তখনও সেচের নালা ঠিক করছেন। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। তার মুখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু হতাশা নেই।
দূর থেকে রহিমা বেগম খাবার নিয়ে এলেন। কলাপাতায় ভাত, আলুভর্তা, শুকনো মরিচ আর পেঁয়াজ।
খেতে খেতে রহিমা বললেন,
— “এত কষ্ট করেন, শরীরের দিকেও একটু খেয়াল রাখুন।”দেলো চাচা মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
— “কৃষকের শরীর বিশ্রাম চায়, কিন্তু জমি অপেক্ষা করে না।”বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় তিনি দেখলেন গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধ রাস্তার পাশে বসে আছেন। তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করলেন। একজন বললেন,
— “দেলো, তোমার মতো মানুষ এখন আর দেখা যায় না।”দেলো চাচা হেসে বললেন,
— “আমি আলাদা কিছু নই। আমি শুধু নিজের কাজটা করার চেষ্টা করি।”সন্ধ্যা নামল। পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে উঠল। মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে এলো। বাড়ি ফিরে তিনি নাতিদের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করলেন। তারা স্কুলের পড়া শোনাল। দেলো চাচার চোখে তখন আনন্দের ঝিলিক।
তিনি মনে মনে ভাবলেন, “আমি হয়তো বেশি পড়তে পারিনি। কিন্তু আমার নাতিরা পড়াশোনা করে বড় মানুষ হবে।”
রাত গভীর হলো। আকাশজুড়ে অসংখ্য তারা। উঠানে খাট পেতে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের কথা—যখন তিনি ছিলেন এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের ছোট ছেলে, আর জীবনের প্রথম লাঙল ধরেছিলেন বাবার হাত ধরে…
সেই স্মৃতি যেন ধীরে ধীরে বর্তমানকে ছাপিয়ে উঠতে লাগল।
চলবে…