1. newsofbangla247@gamil.com : Newsofbanglatv : newsofbanglatv newsofbanglatv
কর্মের আয়নায় মানুষের বড় পরিচয় - News Of Bangla TV কর্মের আয়নায় মানুষের বড় পরিচয় - News Of Bangla TV
September 13, 2026, 3:36 pm

কর্মের আয়নায় মানুষের বড় পরিচয়

মোঃ নাজির হোসেন
  • Update Time : Thursday, August 20, 2026
  • 68 Time View

কর্মের আয়নায় মানুষের বড় পরিচয়

কলমে: মোঃ নাজির হোসেন

মানুষের পরিচয় কি তার জন্মে, বংশে, বিত্তে, পদ-পদবিতে—নাকি তার কর্মে? সভ্যতার শুরু থেকে মানুষকে মূল্যায়নের নানা মানদণ্ড তৈরি হয়েছে। কেউ বংশের মর্যাদায় বড়, কেউ অর্থের প্রাচুর্যে, কেউ ক্ষমতার দাপটে, আবার কেউ জ্ঞান, সততা ও মানবিকতায়। কিন্তু সময়ের নির্মম পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে একটিই পরিচয়—মানুষ তার কর্মে বেঁচে থাকে।

আমাদের সমাজে আজও এমন এক প্রবণতা প্রবল—কেউ বড় পরিবারের সন্তান হলে তাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়, কারও পিতা কিংবা দাদা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলে তার প্রতিও অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেউ অর্থবিত্তের মালিক হলে তার সামনে নত হয় অনেক মাথা। আবার কারও হাতে ক্ষমতা বা বড় কোনো পদ-পদবি থাকলে তার ভুল-ত্রুটিও অনেক সময় উপেক্ষা করা হয়। অথচ একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব ও নৈতিকতার সঙ্গে তার পূর্বপুরুষের পরিচয় কিংবা ব্যাংক হিসাবের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।

পিতা ভালো মানুষ হলেই সন্তান ভালো হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। আবার দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া মানেই কেউ ছোট মানুষ—এ ধারণাও সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। ইতিহাস ও সমাজ আমাদের বারবার দেখিয়েছে, সাধারণ ঘরে জন্ম নেওয়া বহু মানুষ অসাধারণ কর্মের মাধ্যমে নিজেদের এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে বংশের পরিচয় নয়, তাদের কর্মই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় পরিচয়।

জন্ম মানুষের হাতে নয়। কেউ রাজপ্রাসাদে জন্মায়, কেউ কুঁড়েঘরে। কেউ জন্মের সঙ্গে সঙ্গে পায় সম্পদের উত্তরাধিকার, কেউ পায় কেবল সংগ্রামের উত্তরাধিকার। কিন্তু জীবনের পথে কে কী হবে, তা অনেকটাই নির্ধারিত হয় তার চিন্তা, চরিত্র, পরিশ্রম ও কর্মের মাধ্যমে।

পদ-পদবি মানুষের দায়িত্বের পরিচয় হতে পারে, মর্যাদার চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়। একটি চেয়ার কাউকে সাময়িক ক্ষমতা দিতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন দিতে পারে না। অর্থ দিয়ে বাড়ি কেনা যায়, বিলাসিতা কেনা যায়; কিন্তু ভালোবাসা, শ্রদ্ধা কিংবা মানুষের অকৃত্রিম বিশ্বাস কেনা যায় না। ক্ষমতার দাপটে মানুষকে কিছু সময়ের জন্য নীরব রাখা যায়, কিন্তু মানুষের বিবেককে চিরদিনের জন্য জয় করা যায় না।

দাম্ভিকতাও মানুষের বড়ত্বের প্রমাণ নয়। বরং প্রকৃত বড় মানুষ যত বড় হন, তত বেশি বিনয়ী হন। তিনি নিজের পরিচয় প্রচার করতে ব্যস্ত থাকেন না; তার কর্মই তাকে মানুষের সামনে পরিচিত করে তোলে। একটি বৃক্ষ যত ফলবান হয়, তার ডাল তত নুয়ে আসে—মানুষের ক্ষেত্রেও প্রকৃত মহত্ত্বের প্রকাশ ঘটে বিনয়, সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণে।

আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের জায়গাটিতেও তাই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। আমরা সন্তানদের প্রায়ই বলি—‘বড় মানুষ হতে হবে।’ কিন্তু বড় মানুষ বলতে আমরা কী বোঝাই? বড় পদে চাকরি করা? অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া? ক্ষমতাবান হওয়া? নাকি একজন সৎ, দায়িত্বশীল, মানবিক ও বিবেকবান মানুষ হওয়া?

একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যদি অসহায়ের কথা না শোনেন, একজন ধনী ব্যক্তি যদি দরিদ্রকে মানুষ বলে গণ্য না করেন, একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারেন—তবে তার পদ, অর্থ কিংবা প্রভাব যত বড়ই হোক, মানবিক বিচারে তার অবস্থান কতটা উঁচু?

অন্যদিকে, একজন সাধারণ কৃষক যদি ঘাম ঝরিয়ে মানুষের খাদ্য উৎপাদন করেন, একজন শ্রমিক যদি সততার সঙ্গে পরিবার চালান, একজন শিক্ষক যদি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করেন, কিংবা একজন সাধারণ মানুষ যদি বিপদের দিনে অন্যের পাশে দাঁড়ান—তাহলে তাদের কর্মের মহত্ত্ব কোনো পদ-পদবির চেয়ে কম নয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা অনেক সময় মানুষের চরিত্রের চেয়ে তার পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দিই। ‘কার ছেলে?’—এই প্রশ্নটি যেন ‘কেমন মানুষ?’ প্রশ্নটির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে সভ্য হয়ে ওঠে, যখন সেখানে মানুষের মূল্যায়ন হয় তার সততা, যোগ্যতা, কর্ম ও মানবিকতার ভিত্তিতে।

মনে রাখা প্রয়োজন, সম্পদ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায়, পদ-পদবি পরিবর্তনশীল, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী এবং বংশপরিচয় জন্মগত। কিন্তু কর্ম মানুষের নিজের অর্জন। আজ যে ব্যক্তি অন্যায় করছেন, কাল তার পদ নাও থাকতে পারে। আজ যে সম্পদ নিয়ে অহংকার করছেন, কাল তা অন্যের হাতে চলে যেতে পারে। কিন্তু তার কর্মের ভালো-মন্দের স্মৃতি থেকে যায় মানুষের মনে।

তাই আসুন, মানুষকে তার পিতা-মাতার পরিচয়ে নয়, তার নিজের পরিচয়ে বিচার করি। দাদা-পরদাদার কৃতিত্বের ওপর নয়, তার নিজের কর্মের ওপর মূল্যায়ন করি। অর্থের ঝলকানি কিংবা পদ-পদবির চাকচিক্যে মুগ্ধ না হয়ে দেখি তার চরিত্র কতটা স্বচ্ছ, বিবেক কতটা জাগ্রত এবং মানুষের প্রতি তার হৃদয় কতটা উদার।

কারণ শেষ বিচারে মানুষের পাশে তার পদবি থাকে না, সম্পদের পাহাড় থাকে না, ক্ষমতার চেয়ারও থাকে না। থাকে শুধু তার কর্ম—কী করেছেন, কাদের উপকার করেছেন, কতটা সত্যের পথে থেকেছেন এবং মানুষের জন্য কতটুকু ভালো রেখে গেছেন।

জন্ম হোক যথা তথা—কর্মই হোক মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
বংশ নয়, বিত্ত নয়, পদ নয়—একজন মানুষকে বড় করে তার সততা, মানবিকতা ও মহৎ কর্ম।

এটাই হোক আমাদের সমাজের নতুন মূল্যবোধ।

See also  ফিরে এসো শুভ্র শরৎ

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

BD IT HOST