1. newsofbangla247@gamil.com : Newsofbanglatv : newsofbanglatv newsofbanglatv
কলেজে শিক্ষক সংকট বিপর্যয় পাঠদান সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীর - News Of Bangla TV কলেজে শিক্ষক সংকট বিপর্যয় পাঠদান সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীর - News Of Bangla TV
September 12, 2026, 2:34 pm

কলেজে শিক্ষক সংকট বিপর্যয় পাঠদান সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীর

রতন রায় কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • Update Time : Sunday, August 30, 2026
  • 55 Time View

রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে শিক্ষক সংকট বিপর্যয় পাঠদান সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীর

 

রতন রায় :কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
২৮ আগস্ট ২০২৬

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের একাডেমিক ভবনগুলো যেন নীরব সাক্ষী এক অভূতপূর্ব সংকটের। প্রায় সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষার্থীর স্বপ্ন-উচ্চারণ আজ ধুঁকছে মাত্র ২৮ জন শিক্ষকের কাঁধে অথচ এই প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত শিক্ষক পদ ৬০টি। শূন্য ৩২টি পদ, যার মধ্যে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষকের পদ ফাঁকা। বিজ্ঞান, ইংরেজি, গণিত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার এসব শাখায় নেই নিয়মিত শিক্ষক। দীর্ঘদিনের এই জনবল ঘাটতি, প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই যেন নতুন আশার আলো দেখাচ্ছেন অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. জহুরুল হক, যিনি গত ৮ জুন ২০২৬ তারিখে যোগদান করে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ফেরাতে শুরু করেছেন এক অভিযান।

শিক্ষক সংকটে বিপর্যস্ত পাঠদান:

কলেজটিতে একাদশ-দ্বাদশ, স্নাতক ও ছয়টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু থাকলেও পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে ক্লাস নিয়মিত হয় না। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ব্যবহারিক কক্ষগুলো ছিল দীর্ঘদিন অব্যবহৃত; শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা নিয়ে শঙ্কিত। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সিরাতুন বিনতে বুশরা বলেন, “বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েও শিক্ষকসংকটের কারণে মানবিক বিভাগে ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু এখানেও ইংরেজিসহ কয়েকটি বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি শঙ্কিত।”

প্রভাষক তপতি রানী জানান, “শিক্ষকঘাটতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে বিজ্ঞান বিভাগে। ব্যবহারিক ও পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, আর ফলে আসন থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী ভর্তি কমে যাচ্ছে যা সামগ্রিক ফলাফলেও প্রভাব ফেলবে।” প্রভাষক সাহেব আলী সংযোজন করেন, “পদসংখ্যা ৬০টি হলেও কর্মরত ২৮ জন। গ্রন্থাগারিক, শরীরচর্চা শিক্ষক ও প্রদর্শক পদেও জনবল নেই। ১২টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম চরম ব্যহত।”

See also  দেবহাটায় প্রতিবন্ধীদের মাঝে হুইল চেয়ার বিতরন

দীর্ঘ ৫৩ বছর পর স্থায়ী অধ্যক্ষ, মিলল প্রশাসনিক চাঙ্গাভাব

১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মীর মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহর হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় এই কলেজের। ২০০০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের তত্ত্বাবধানে চললেও প্রশাসনিক দুর্বলতা থেকে যায়। ২০১৮ সালে কলেজটি সরকারি হওয়ার পরও স্থায়ী অধ্যক্ষের অভাবে সেই জটিলতা ঘোচেনি। অবশেষে ২২তম বিসিএস ক্যাডার প্রফেসর মো. জহুরুল হক ২০২৬ সালের ৮ জুন অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর আগমনে শিক্ষক-কর্মচারী থেকে শিক্ষার্থী সবার মধ্যেই তৈরি হয়েছে নতুন উদ্যম।

তবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই অধ্যক্ষের চোখ খুলে যায় আর্থিক শূন্যতার চিত্র। কলেজের ৩৩টি ব্যাংক হিসাবের মধ্যে ১৬টিতে অর্থ থাকলেও কয়েকটি হিসাবে ছিল একেবারে শূন্য, একটি চলতি হিসাবে মাত্র ৩০০ টাকা। তিনি বলেন, “আমি প্রথমেই অগ্রাধিকার দিই বকেয়া বেতন পরিশোধে, কারণ অতিথি শিক্ষক ও মাস্টাররোল কর্মচারীদের দুই মাসের বেতন বকেয়া ছিল। তা পরিশোধ করেছি। এখন শিক্ষকসংকট কাটাতে ১২ জন নতুন অতিথি শিক্ষক নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি; বর্তমানে তিনজন অতিথি শিক্ষক কাজ করছেন।”

শৃঙ্খলা ফিরল বাড়ল দায়িত্ববোধ:

অধ্যক্ষ যোগদানের পর প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে ফ্যান বসানো, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, জরাজীর্ণ ল্যাব সংস্কার, সীমানাপ্রাচীর মেরামত এবং ছাত্রীদের বাথরুম পুনর্নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে শুরু হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিতে প্রতি ১০ জনের জন্য একজন শিক্ষককে মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যিনি প্রতিটি শিক্ষার্থীর অগ্রগতি ও অনুপস্থিতির কারণ খতিয়ে দেখছেন।

প্রভাষক মিনারা বেগম বলেন, “শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে নতুন অধ্যক্ষের দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রশংসনীয়। মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হওয়ায় ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ কমেছে।” প্রভাষক সংগীতা রানী উল্লেখ করেন, “প্রশাসনিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরেছে। রেজিস্টার, ক্যাশবই ও চেকবই সংরক্ষণ এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নজরদারির আওতায় এসেছে এটি দীর্ঘদিন পর সম্ভব হলো।”

প্রভাষক ফাতেমা বেগম জানান, “অধ্যক্ষ স্যার আসার পর পুরোনো ভবনের প্রতিটি অংশে সংস্কার কাজ চলছে। শ্রেণিকক্ষে ফ্যান, ল্যাব রিনোভেশন, সিসিটিভি সব কিছুই শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।”

See also  সাপাহার সরকারি কলেজে রোভার স্কাউটস গ্রুপের বৃক্ষরোপণ অভিযান

 

অতিথি শিক্ষক চৌধুরী রিংকু র‍্যাবেন আবেগভরে বলেন, “আমাদের এবং মাস্টাররোল কর্মচারীদের দুই মাসের বেতন বকেয়া ছিল, যা অধ্যক্ষ স্যার যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণ পরিশোধ করেন। এর আগে আমরা অনেক অভাব নিয়ে চলেছি।” কলেজের কর্মচারী নিতাই চন্দ্র রায় হাসিমুখে বলেন, “এখন আর কলেজ ফাঁকি দেওয়া যায় না। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। মনে হয়, প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হাবিবুল্লাহ স্যার মারা যাননি, তিনি আবার কলেজে ফিরে এসেছেন।” তাঁর এই মন্তব্য প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের সময়কার শৃঙ্খলা ও কর্মনিষ্ঠার স্মৃতিকে উজ্জীবিত করে।

সহকারী অধ্যাপক সাজেদুর রহমান মণ্ডল যোগ করেন, “দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের প্রশাসনিক দুর্বলতা কাটিয়ে এখন সবার মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা ফিরেছে এবং সবাই দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছেন এটি একটি বড় ইতিবাচক দিক।”

শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা

শিক্ষকসংকটের কবলে পড়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও চিন্তা বাড়ছে। একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র রাকিব হোসেন বলে, “আমরা ব্যবহারিক করতে চাই, কিন্তু শিক্ষক না থাকায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। জিপিএ ভালো করেও যদি ভালো শিক্ষা না পাই, তাহলে এই প্রতিষ্ঠানে কেন ভর্তি হব?” অভিভাবকদের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে। কলেজের পাশের এলাকার বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, “শিক্ষক না থাকলে পড়ালেখা কীভাবে হবে? সরকারি কলেজ হওয়ার পরও এই অবস্থা খুবই দুঃখজনক।”

অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. জহুরুল হক জানান, “কলেজে নানা সমস্যা রয়েছে, তবে আমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতিথি শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা চালাচ্ছি। শিক্ষার পরিবেশ ফেরাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও স্থানীয় সুশীল সমাজের সহযোগিতা জরুরি।” তিনি আরও বলেন, “আমি যখন যোগ দিই, তখন ব্যাংক হিসাবের অবস্থা দেখে হতবাক হয়েছি। এখন অর্থ সংকট কাটাতে এবং জনবল ঘাটতি পূরণে সরকারের কাছে বাজেট ও নিয়োগ বাবদ আবেদন করেছি।”

শৃঙ্খলা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুরু হলেও ৬০টি পদের বিপরীতে ৩২টি পদ শূন্য থাকা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি দ্রুত শিক্ষক সংকট সমাধান করা যায়, তাহলে এই প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসতে পারে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফল। দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি যেন আবারও জ্ঞানের আলো ছড়াতে পারে সে জন্য প্রয়োজন সব পক্ষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সাংবাদিকরা ইতিমধ্যেই শিক্ষক নিয়োগে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

See also  হারানো বিজ্ঞপ্তি নাম: রাতুল বয়স : ৩ বছর

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

BD IT HOST